‘সিনেমায় আমাকে দেখে তারা খারাপ ভেবেছে, এতেই আমার আনন্দ’—এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। পর্দায় তাঁর অভিনয় দেখে দর্শক কখনো হেসেছেন, কখনো কেঁদেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি যে অনুভূতিটি তৈরি হয়েছে, তা হলো ঘৃণা। খল চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, দর্শক বাস্তব জীবনেও তাঁকে সেই চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতেন। আর সেখানেই একজন খল অভিনেতার সার্থকতা।
১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, যিনি এটিএম শামসুজ্জামান নামে সর্বাধিক পরিচিত। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে খল চরিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে আলাদা একটি জায়গা তৈরি করে।
অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার ও নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর অভিনয়জীবনের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা। একুশে পদকসহ নানা রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক সম্মান পেয়েছেন এই গুণী শিল্পী।
বন্ধুত্বের স্মৃতি
স্কুলজীবনে শিল্পী রফিকুন নবীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল এটিএম শামসুজ্জামানের। রফিকুন নবী প্রায়ই তাঁকে বলতেন, ‘কাল স্কুলে আসার সময় মাথায় তেল দিয়ে আসিস।’
বন্ধুর কথামতো তেল দিয়ে স্কুলে যেতেন এটিএম। আর সেই তেলমাখা মাথা হয়ে উঠত বন্ধুর আঁকার খাতা! খাতার সাদা পাতা তাঁর মাথায় ঘষে নিয়ে রফিকুন নবী সেই পাতায় ইচ্ছেমতো ছবি আঁকতেন। শৈশবের এই স্মৃতি পরবর্তী জীবনে দুজনের বন্ধুত্বের একটি মজার অধ্যায় হয়ে থাকে।
নাটকের মহড়ায় ঢোকার কৌশল
ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। পাড়ায় নাটকের মহড়া হলে সেখানে ভিড় জমত। কিন্তু বালক এটিএমকে কেউ মহড়ার ঘরে ঢুকতে দিতেন না।
একদিন অভিনব কৌশল নিলেন তিনি। নাটকের শিল্পীদের চা খাওয়ানোর কথা বলে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকে পড়লেন মহড়াকক্ষে। পরে একদিন নাটকের প্রম্পটার উপস্থিত না থাকায় সুযোগটি কাজে লাগান তিনি। প্রম্পটারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ধীরে ধীরে নাটকের একজন শিল্পী হয়ে ওঠেন।
ধৈর্যের পরীক্ষা
চলচ্চিত্রে কাজের আশায় পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর কাছে গিয়েছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। পরিচালক তাঁকে ৫০০ পৃষ্ঠার একটি পাণ্ডুলিপি দিয়ে বললেন, দ্রুত তিনটি কপি করে আনতে।
রাত জেগে পরিশ্রম করে মাত্র ১২ দিনের মধ্যে তিনটি কপি তৈরি করে জমা দেন তিনি। পাণ্ডুলিপি দেখে পরিচালক প্রশংসা করলেন। এরপর তিনটি কপিই ময়লার বাক্সে ফেলে দিলেন।
বিষয়টি দেখে বিস্মিত হয়ে যান এটিএম। তখন উদয়ন চৌধুরী জানান, তিনি আসলে এটিএমের ধৈর্য ও পরিশ্রমের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় তাঁকে নিজের তৃতীয় সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ দেন।
‘নয়নমণি’ দিয়ে পরিচিতি
পরিচালক আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ চলচ্চিত্রে মোড়লের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান এটিএম শামসুজ্জামান। প্রথমে তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি। নিজের চেহারা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, তাঁর সঙ্গে মজা করা হচ্ছে।
কিন্তু আমজাদ হোসেন তাঁকে সত্যিই চরিত্রটির জন্য নির্বাচিত করেছিলেন। ‘নয়নমণি’ মুক্তির পর তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। এই চলচ্চিত্র তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে।
পর্দার খলনায়ক, বাস্তবের মানুষ
খল চরিত্রে এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয় এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে, অনেক দর্শক তাঁকে পর্দার চরিত্রের সঙ্গে এক করে ফেলতেন।
একবার জুমার দিনে পাঞ্জাবি-পাজামা পরে মসজিদে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় যাচ্ছেন। এটিএম জানান, মসজিদে যাচ্ছেন।
তখন ওই ব্যক্তি তাঁকে বলেন, ‘জুম্মার নামাজ পড়ে আপনার লাভ কী? জীবনে এত আকাম করেছেন—আপনি একটা বাজে লোক!’
পর্দায় তাঁর অভিনয়ের প্রভাব কতটা গভীর ছিল, এই ঘটনাই যেন তার প্রমাণ। দর্শকের সেই ‘ঘৃণা’ আসলে ছিল তাঁর অভিনয় প্রতিভারই স্বীকৃতি।
অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে নিজেকে ভেঙে-গড়ে উপস্থাপন করেছেন এটিএম শামসুজ্জামান। কখনো খলনায়ক, কখনো হাসির চরিত্র, কখনো আবেগঘন কোনো চরিত্র—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজস্ব অভিনয়শৈলীর ছাপ রেখেছেন।
২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি না ফেরার দেশে চলে যান বাংলা অভিনয়জগতের এই কিংবদন্তি। তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। তবে তাঁর অভিনীত অসংখ্য চরিত্র আজও দর্শকের মনে জীবন্ত।
পর্দায় দর্শকের হাসি-কান্না কিংবা ঘৃণা—সবকিছুকে অভিনয়ের সাফল্যে পরিণত করতে পেরেছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, এক অনন্য অভিনয়-প্রতিভার নাম।
রিপোর্টার 




















