নতুন কোনো জায়গায় গেলে প্রথম রাতটা কেমন যেন অস্বস্তির। বিছানা আরামদায়ক, ঘরও শান্ত—তারপরও ঘুম আসতে চায় না। একবার ঘুম এলেও মাঝরাতে বারবার চোখ খুলে যায়। সকালে উঠে মনে হয়, অন্য দিনের তুলনায় ঘুমটা যেন ঠিকমতো হয়নি।
বিষয়টি শুধু নতুন বিছানা কিংবা অপরিচিত ঘরের কারণে নয়। ঘুমবিজ্ঞানীরা এর পেছনে মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া খুঁজে পেয়েছেন। এর নাম ‘ফার্স্ট-নাইট ইফেক্ট’। অপরিচিত পরিবেশে প্রথম রাতে ঘুমের ধরন কিছুটা বদলে যাওয়াকেই বলা হয় ফার্স্ট-নাইট ইফেক্ট।
নতুন জায়গায় মস্তিষ্ক কেন সতর্ক থাকে?
অপরিচিত পরিবেশে প্রথম রাতে মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিশ্রামের অবস্থায় যেতে পারে না। মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেও পরিবেশটি নতুন হওয়ায় মস্তিষ্কের কিছু অংশ তুলনামূলক সতর্ক থাকে।
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ফ্রেইবুর্গের ঘুম গবেষক আনা উইকের মতে, এটি মানুষের মস্তিষ্কের একটি অভিযোজনমূলক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। অর্থাৎ, অপরিচিত পরিবেশে ঘুমানোর সময় মস্তিষ্ক আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা বেশি সজাগ থাকে।
নতুন জায়গাটি নিরাপদ কি না, আশপাশে অস্বাভাবিক কোনো শব্দ হচ্ছে কি না—এ ধরনের বিষয় মস্তিষ্কের নজর এড়িয়ে যায় না। ফলে শরীর ঘুমিয়ে থাকলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না।
ঘুমের সময় কমে, ঘুমও হতে পারে হালকা
পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম গবেষক আহমাদ মায়েলির গবেষণায়ও নতুন জায়গায় প্রথম রাতের ঘুমের পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, অনেক মানুষই কোনো না কোনো মাত্রায় ফার্স্ট-নাইট ইফেক্টের শিকার হন।
কারও ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, আবার কেউ তা আলাদা করে টেরই পান না। তবে নতুন পরিবেশে ঘুমের সময় কিছুটা কমে যেতে পারে এবং ঘুম তুলনামূলক হালকা হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, মস্তিষ্কের কিছু অংশ এ সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে গভীর ঘুমে যেতে কিছুটা সময় লাগে কিংবা ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
এ কারণেই নতুন জায়গায় প্রথম রাতের ঘুমকে অনেকের কাছে ‘অপূর্ণ’ মনে হয়।
শুধু অপরিচিত জায়গাই দায়ী নয়
নতুন জায়গায় ঘুম না আসার পেছনে শুধু মস্তিষ্কের সতর্কতাই দায়ী নয়। ভ্রমণের ক্লান্তি, অপরিচিত শব্দ, ঘরের আলো, তাপমাত্রা কিংবা বিছানার সামান্য পার্থক্যও ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।
হোটেলের ঘরে কোনো যন্ত্রের আলো জ্বলা, বাইরে গাড়ির শব্দ, অপরিচিত মানুষের চলাফেরা কিংবা ঘরের পরিবেশ—ছোটখাটো বিষয়ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
আবার এমন কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে থাকা, যাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নেই, সেটিও কারও কারও মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
তবে অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। দীর্ঘ ভ্রমণের পর অতিরিক্ত ক্লান্ত কেউ কেউ নতুন জায়গায় প্রথম রাতেই ভালো ঘুমাতে পারেন। আবার কারও জন্য নতুন জায়গা প্রতিদিনের কাজের চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকার সুযোগ তৈরি করে। সে ক্ষেত্রে ঘুম বরং ভালোও হতে পারে।
ঘুম হবে তো—এই চিন্তাই আবার ঘুম কেড়ে নেয়
যারা সাধারণভাবে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। নতুন জায়গায় যাওয়ার আগেই যদি মনে হতে থাকে, ‘আজ রাতে ঠিকমতো ঘুম হবে না’, তাহলে সেই দুশ্চিন্তাই ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একসময় ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা একটি চক্র তৈরি করে—ঘুম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে, উদ্বেগের কারণে ঘুম কমে, আর কম ঘুম হওয়ায় পরের রাতে ঘুম নিয়ে আরও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।
গবেষকদের ধারণা, ফার্স্ট-নাইট ইফেক্টের পেছনে মানুষের বিবর্তনগত ইতিহাসেরও ভূমিকা থাকতে পারে। অতীতে অপরিচিত জায়গায় ঘুমানো তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই নতুন পরিবেশে মস্তিষ্ক পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে কিছুটা সময় নেয়।
বয়সেও প্রভাব পড়ে
ফার্স্ট-নাইট ইফেক্টের মাত্রা বয়সভেদে ভিন্ন হতে পারে। শিশু, কিশোর-কিশোরী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। তরুণদের মধ্যে এ প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে।
তবে ব্যক্তিভেদে পার্থক্যও রয়েছে। একই পরিবেশে একজনের ঘুমে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলেও অন্যজন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই ঘুমাতে পারেন।
নতুন জায়গায় ভালো ঘুমের জন্য যা করবেন
প্রথম রাতেই ‘আজ ভালো ঘুমাতেই হবে’—এমন চাপ না নেওয়াই ভালো। বরং বাড়িতে যে ঘুমের রুটিন অনুসরণ করেন, নতুন জায়গাতেও সেটি যতটা সম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করুন।
যা করতে পারেন—
- প্রতিদিনের কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- ঘর যতটা সম্ভব শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন।
- ঘুমের আগে পরিচিত একটি রুটিন অনুসরণ করুন।
- ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোন ও কম্পিউটারের ব্যবহার কমিয়ে দিন।
- নতুন বিছানায় কিছুটা সময় কাটান, বই পড়ুন বা শান্ত কোনো পরিচিত কাজ করুন।
- সম্ভব হলে নিজের পরিচিত বালিশ, চাদর বা অন্য কোনো আরামদায়ক জিনিস সঙ্গে রাখুন।
- গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠান বা কাজ থাকলে সম্ভব হলে এক রাত আগে গন্তব্যে পৌঁছান।
পরিচিত কোনো শান্ত জায়গার কথা মনে মনে কল্পনা করাও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্বস্তি দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রথম রাতে ঘুম একটু কম হলেই সেটিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখবেন না।
এক রাত কম ঘুম নিয়ে কি চিন্তার কারণ আছে?
সাধারণত নতুন জায়গায় এক রাতের ঘুম কিছুটা কম হওয়া নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর অনেকের ঘুম স্বাভাবিক হয়ে আসে।
তবে যদি ঘুমের সমস্যা শুধু ভ্রমণের সময় নয়, নিয়মিতভাবে বাড়িতেও দেখা দেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা মনোযোগে প্রভাব ফেলে, তাহলে চিকিৎসক বা ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নতুন জায়গায় প্রথম রাতে ঘুম একটু কম হওয়া তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। অচেনা ঘর, নতুন শব্দ ও অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে মস্তিষ্কের কিছুটা সময় লাগতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রেই প্রথম রাত পার হওয়ার পর এই প্রভাব কমে যায় এবং ঘুম ফিরে আসে নিজের পরিচিত ছন্দে।
খোঁজ নিউজ ডেস্ক 












